বাঁকুড়ার হাতি-ঘোড়ার পূজা: পোড়ামাটির শহরে এক অনন্য বিশ্বাসের গল্প
বাংলার হৃদয়ে এক অদ্ভুত মায়াময় জায়গা আছে, যাকে আমরা বলি বাঁকুড়া। মল্ল রাজাদের শহর, পোড়ামাটির শহর, লাল পাহাড়ের দেশ, আর মারাংকুরু ভক্তদের তীর্থভূমি। বাঁকুড়া মানেই ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি আর বিশ্বাসের মিলনক্ষেত্র। এবারের ভ্রমণে আমরা রওনা দিলাম কামারপুকুর-জয়রামবাটি ঘুরে বাঁকুড়ার দিকে। উদ্দেশ্য একটাই—সেই বিখ্যাত পোড়ামাটির শহরের রূপ দেখা, আর অনুভব করা বাঁকুড়ার হাতি-ঘোড়ার পূজার আবহ।
বাঁকুড়ার পথে
সকালে আমরা রওনা দিলাম। গ্রামবাংলার রাস্তা ধরে যেতে যেতে চোখে পড়ছে কাঁচা রাস্তার পাশে সারি সারি খেজুর গাছ, লাল মাটির পথ, আর দূরে সবুজের গালিচা। বাঁকুড়ার সৌন্দর্য এক অন্য মাত্রার। শহরে ঢোকার মুখেই মনে হল—হ্যাঁ, এটাই সেই লাল পাহাড়ের দেশ, যেখানে শিল্প আর বিশ্বাস মিশে গেছে যুগের পর যুগ।

পোড়ামাটির শহরের গল্প
বাঁকুড়া মানেই পোড়ামাটির শিল্প। শত শত বছর ধরে এখানে গড়ে উঠেছে অসাধারণ টেরাকোটা শিল্পের ঐতিহ্য। গ্রামের শিল্পীরা আজও হাতে গড়া ঘোড়া, হাতি, সিংহ, পাখি তৈরি করেন। এই শিল্প শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়—এটা গ্রামীণ ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে।
অটোতে যেতে যেতে চোখে পড়ল রাস্তার ধারে বড়ো একটা গাছের নিচে সারি সারি মাটির ঘোড়া সাজানো। কৌতূহল আমাকে নামিয়ে আনল। অটো কাকুকে জিজ্ঞেস করলাম—“কাকু, এগুলো এখানে কেন রাখা?”
কাকুর উত্তর শুনে আমি যেন ইতিহাসের অন্দরমহলে ঢুকে পড়লাম। তিনি জানালেন—“দেখুন, আমাদের বাঁকুড়ায় পোড়ামাটির কাজ যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন, কোনো মানত করলে সেটা পূর্ণ করতে হলে মাটির ঘোড়া বা হাতি নিবেদন করতে হয় দেবতাকে। ঘোড়া যেহেতু দ্রুত দৌড়ায়, তাই অনেকে ঘোড়া নিবেদন করে—তাদের বিশ্বাস, তাতে মানত তাড়াতাড়ি পূর্ণ হয়।”

বনবুড়ির তলায় হাতি-ঘোড়ার পূজা
সেই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে দেখি কিছু ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে খেলছে। তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—“এখানে পূজা হয় নাকি?”
তাদের একজন বলল—“এটা বনবুড়ির তলা। এখানে বারো ভুঁইয়ার বনবুড়ি দেবী থাকেন। মানুষ আসে মানত করতে। কেউ রোগ সারাতে, কেউ ভালো ফলাফলের জন্য, কেউ আবার সংসারের শান্তির জন্য।”
চারপাশটা যেন একেবারে গ্রামীণ মেলাঘরের মতো। ছোট ছোট টেরাকোটা ঘোড়া, হাতি, সিংহ সারি সারি সাজানো। একই মণ্ডপে পূজিত হচ্ছে বনবুড়ি দেবী, ধর্মঠাকুর আর অন্যান্য লোকদেবতা। শুনলাম এখানে নিয়ম করে ধর্মঠাকুরের মেলাও বসে। পশু বলিরও চল আছে কিছু জায়গায়।
লোকবিশ্বাসের অটল ধারা
সময়ের সঙ্গে বদল এসেছে মারাংকুরু ভক্তদের জীবনযাত্রায়। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে বাঁকুড়ার গাঁ-গঞ্জেও। কিন্তু লোকবিশ্বাসের এই ধারা আজও ততটাই শক্তিশালী। আজও মানুষ মনে করেন, দেবতাকে টেরাকোটা ঘোড়া নিবেদন করলে ইচ্ছা পূর্ণ হয়। এই বিশ্বাসই মানুষকে বারবার টেনে আনে এই পূজামণ্ডপে।
এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

টেরাকোটা ঘোড়া শুধু পূজার প্রতীক নয়, এটা বাংলার লোকশিল্পেরও এক অসাধারণ নিদর্শন। এই শিল্প আজ ইউনেস্কোর তালিকায় স্থান পেয়েছে। বাঁকুড়ার বিক্রমপুর, বিষ্ণুপুর, জয়পুর—সব জায়গাতেই এই টেরাকোটা শিল্পের ছোঁয়া পাওয়া যায়।
আমাদের ভ্রমণ শেষ হল বনবুড়ির তলায় কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে। মনে হল, গ্রামীণ সংস্কৃতির এই ধারাকে চোখের সামনে দেখা সত্যিই এক বড়ো অভিজ্ঞতা। শহুরে ব্যস্ততার বাইরে এইসব ছোট্ট গ্রামোৎসব, পূজা-পার্বণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিশ্বাস আর সংস্কৃতিই আমাদের সমাজের আসল শক্তি।
ভ্রমণপিপাসুদের জন্য পরামর্শ
যদি কখনো বাঁকুড়া ঘুরতে যান, তবে অবশ্যই সময় করে এই হাতি-ঘোড়ার পূজা দেখে আসবেন। এটি কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয়—এটি এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। মাটির ঘোড়ার সারি, পূজার মণ্ডপ, গ্রামীণ মেলা—সবকিছু আপনাকে অন্য এক সময়ের গল্প শোনাবে।




