মাগধী প্রাকৃত ভাষা থেকে উৎপন্ন আমাদের বাংলা ভাষা। আর আমাদের বাংলাসাহিত্য চরিত্রগতভাবে কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যক্তি নিরপেক্ষ; আমাদের পূর্বপুরুষেরা “কী বলেছেন“, “কেন বলেছেন“, “কোথায় বলেছেন“, “কীভাবে বলেছেন“, এবং “কাকে বলেছেন” এই সব সংকলন করেই বর্তমানে সাহিত্য রচনার প্রচলন। কাব্যিক ভাষা কিংবা এক কথায় বলতে গেলে, “বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্য নামে পরিচিত“।
আসল কথা হল, মানুষ যেদিন থেকে লিখতে পড়তে শিখেছে তবে থেকেই সাহিত্য রচনার প্রচলন ঘটেছে। আদিমকালে পাথরের গায়ে লিখে রাখা কোন ছবি বা চিহ্ন হঠাৎ আবিষ্কার হলে সেটাও সাহিত্য। কিংবা গাছের পাতা বা ছালে লিখে রাখা কোন অক্ষর বা চিহ্ন, তাও তো সাহিত্য। মানতে ইচ্ছা না করলেও একটু খুঁজলে দেখা যায় বাস্তবর্থে প্রাচীনকালে লিপিতে লিখে রাখা অহেতুক নকশা দিয়েই বর্তমানে ভাষাবিদগণ সাহিত্য রচনা উপস্থাপনা করছেন।
সাহিত্য তাহলে সাহিত্য কালে বলে ?
“সাহিত্য হলো নিজের কথা“। কোন ব্যক্তি যদি নিজের মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য কোনো কিছু লিখে রাখেন তাই হলো সাহিত্য। যুগের পর যুগ চলে আসছে এসব সাহিত্য রচনা করে।

“সাহিত্য” শব্দটির সহজ অর্থ হলো—সঙ্গ বা সহভাগিতা। কিন্তু এর গভীর অর্থ অনেক বিস্তৃত। সাহিত্য মানে কেবল কিছু লেখা নয়; এটি হলো মানুষের মনের ভাব, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার রূপায়ণ। কোনো ব্যক্তি যদি নিজের অনুভূতি, চিন্তা, অভিজ্ঞতা কিংবা সমাজের বাস্তবতা লিখে রাখেন, তাই-ই সাহিত্য। তাই সাহিত্যকে বলা যায়—“নিজের মনের কথা”।
মানবসভ্যতার আদিকাল থেকেই সাহিত্য রচনার সূত্রপাত। মানুষ যখন লিখতে পড়তে শেখেনি, তখনও গুহাচিত্র, পাথরের গায়ে আঁকা অদ্ভুত সব রেখা বা প্রতীক, গাছের ছাল বা পাতায় খোদাই করা কোনো চিহ্ন—এসবকেই আমরা সাহিত্যর প্রাচীনতম রূপ বলে মানতে পারি। সেই সময় মানুষ ছবি এঁকে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করত, যা আজকের দিনে ভাষা ও অক্ষরে রূপান্তরিত হয়েছে। সুতরাং সাহিত্যকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ করা যায় না; মানুষের অভিব্যক্তি প্রকাশের সব মাধ্যমই সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ব্যক্তিনিরপেক্ষ ধারা। অর্থাৎ এখানে লেখক ব্যক্তি নয়, বরং তাঁর লেখা, বক্তব্য, ভাবনা, কোথায় এবং কেন তিনি লিখেছেন—এসবকেই প্রধান বিবেচনা করা হয়। এজন্যই যুগের পর যুগ ধরে বাংলা সাহিত্য সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন হয়ে এসেছে।

বাংলা সাহিত্যের যুগভাগ
কালবিচারে বাংলা সাহিত্যকে সাধারণত তিনটি প্রধান যুগে ভাগ করা হয়—
১. প্রাচীন যুগ (৬৫০–১২০০)
২. মধ্যযুগ (১২০০–১৮০০)
৩. আধুনিক যুগ (১৮০০–বর্তমান)
প্রাচীন যুগ (৬৫০–১২০০)
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হলো চর্যাপদ। এগুলো ছিল বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত গানের মতো কবিতা, যেখানে গভীর আধ্যাত্মিক তত্ত্ব সাধারণ প্রকৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এই গানের ভাষা ছিল সন্ধ্যাভাষা—যেখানে সরল অর্থের আড়ালে লুকিয়ে থাকত আধ্যাত্মিক সংকেত।
- এ সময়ের সাহিত্য মূলত মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল।
- প্রকৃতি, নদী, মাঠ-ঘাট ও গ্রামীণ জীবন এসময়ে রচিত চর্যাপদের কাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
- মূলত চর্যাপদ থেকেই আমরা বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপ সম্পর্কে ধারণা পাই।
মধ্যযুগ (১২০০–১৮০০)
এই যুগে বাংলা সাহিত্য নানা ধারায় সমৃদ্ধ হয়। ধর্মীয় ভক্তি, পুরাণকাহিনি, প্রেম, লোকবিশ্বাস—সব মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যের এক বর্ণময় অধ্যায় রচিত হয়।
১. মঙ্গলকাব্য – দেবদেবীর মাহাত্ম্যকীর্তনমূলক কাব্য, যেমন মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল। এ কাব্যে স্থানীয় সমাজজীবন ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপও উঠে এসেছে।
২. ভক্তিকাব্য – চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের ফলে বৈষ্ণব পদাবলীর বিস্তার ঘটে। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি প্রমুখ কবি রাধা-কৃষ্ণ প্রেমকে ভক্তিরূপে প্রকাশ করেন।
৩. শাক্তপদাবলী – কালিকা বা দুর্গার উদ্দেশ্যে রচিত ভক্তিগীতি। রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত প্রমুখ কবি মাতৃভক্তির মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ভাব ফুটিয়ে তোলেন।
4. সুফি ও পুঁথিসাহিত্য – মুসলিম কবিগণ সুফি মতবাদ, প্রেম ও আধ্যাত্মিক চিন্তা নিয়ে কাব্য রচনা করেন। ইউসুফ-জুলেখা বা গাজী কাহিনি এই ধারার অন্তর্ভুক্ত।
৫.লোকসাহিত্য – বাউল গান, জারি-সারি, ভাটিয়ালি, কীর্তন, জাত্রা—এসব লোকসাহিত্য মধ্যযুগে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
এই যুগের সাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্য হলো বহুমাত্রিকতা — পাওয়া যায় হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মীয় ধারার মিলন, গ্রামীণ ও রাজসভা উভয় পরিবেশের চিত্রণ।
আধুনিক যুগ (১৮০০–বর্তমান)
মোটামুটিভাবে ইং ১৮০০ সাল থেকে শুরু হয় বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ। এ সময় বাংলায় মানুষের মধ্যে প্রসারিত হয় ইউরোপীয় চিন্তাধারার। আর মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার ও আধুনিক শিক্ষার প্রসার ইত্যাদির ফলে সূচনা হয় সাহিত্যে নবজাগরণের।
১. উনিশ শতক –
এইসময়
- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের সহজ ও সুন্দর রূপ গড়ে তোলেন।
- মাইকেল মধুসূদন দত্ত কাব্যে পাশ্চাত্য ধারা প্রবর্তন করেন (মেঘনাদবধ কাব্য)।
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাসের জনক হিসেবে আবির্ভূত হন এবং সাহিত্যিক হিসেবে প্রভূত সুখ্যাতি অর্জন করেন। বাস্তবর্থে এইসময় বঙ্কিমচন্দ্র মহাশয়ের হাত ধরেই হয় বাংলা সাহিত্যের প্রমিতকরণ।
২. বিশ শতকের প্রথমার্ধ –
- এইসময় বাংলা সাহিত্যকে নবকলেবরে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর কবিতা, গান, গল্প, নাটক সর্বত্র ছড়িয়ে দিল মানবতাবাদের আলো।
- আর তার পরেই কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে এনে দিলেন নতুন শক্তি তাঁর বিদ্রোহী কবিতা ও সংগীতের মাধ্যমে।
- এসময়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপস্থাপন করেন গ্রামীণ ও সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনের নানা কাহিনী, এক নতুন রূপে, সম্পূর্ণ বাস্তবধর্মীভাবে। আবার তাঁর হাত ধরেই এইসময় বাঙালী মনে ঢুকে গেল পরিবেষ্টক সমাজব্যবস্থা, ও স্বনির্ভর গোষ্ঠী জীবন সম্বন্ধে কানারত্মক চিন্তাধারা। জন্ম নিল বিত্ত ও বিত্তশালীদের প্রতি আন্তিরক বিদ্বেষ। জন্ম নিল ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থশিক্ষা, বৈষয়িক শিক্ষা, বৈষয়িক চিন্তাধারা ইত্যাদি সমাজ সংগঠক প্রগতিশীল চিন্তাধারার প্রতি প্রবল বিদ্বেষ, যার সুদূর প্রভাব আমরা আজও বঙ্গসমাজের অনেক অংশেই দেখতে পাই। Raise Your Concern About this Content
৩. বিশ শতকের মধ্যভাগ –
- বাংলা আধুনিক কবিতায় এক নীরব বিপ্লব জিতলেন জিবনানন্দ দাশ।
- গ্রামীণ জীবনের অনন্যসাধারণ সব ছবি এঁকে দেখালেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঙালী সাহিত্য পেল পথের পাঁচালী‘র মত কিছু অনন্যা গ্রন্থ।
- তৎকালীন সমাজবাস্তবতা লেখনীর বাধ্যমে আরো বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়’রা।

৪. বাংলাদেশে সাহিত্য আন্দোলন –
- ১৯৫২ সালে বাংলাদেশ দেখল ভাষা আন্দোলন, দেশ ধর্মের মায়াজাল কাঁটিয়ে বাংলা সাহিত্যে দেখা গেল নতুন প্রেরণা। বঙ্গ প্রদেশের মানুষও স্বাদরে গ্রহণ করল এই প্রেরণাকে।
- এ সময় বিশেষভাবে আলোচিত হল শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, জসীমউদ্দীন প্রমুখ কবি-লেখক লেখা।
- বঙ্গপ্রেদেশের কথ্য ভাষাকেই বাংলা লেখ্য ও কথ্যভাষার মূলধারা হিসেবে এপার -ওপর দুই বাংলার মানুষই দিল স্বীকৃতি।
- ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারার জন্ম দেয়।
৫. সমসাময়িক সাহিত্য –
- পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উভয় বাংলাতেই আজকের সাহিত্য বহুমাত্রিক।
- উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, কবিতা, শিশুসাহিত্য, বিজ্ঞানকল্পকাহিনি, ভ্রমণকাহিনি—সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে।
- শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, হুমায়ূন আহমেদ, সেলিনা হোসেন প্রমুখ লেখক সমকালীন সাহিত্যে বিশেষভাবে আলোচিত।
মূল বৈশিষ্ট্য
- প্রকৃতিনির্ভরতা – বাংলার নদী, মাঠ, গ্রাম, ঋতু প্রভৃতি সাহিত্যে সর্বত্র প্রতিফলিত।
- ভক্তি ও মানবতাবাদ – দেবতা থেকে শুরু করে মানবপ্রেম পর্যন্ত সাহিত্য ভরপুর ভক্তি ও আবেগে।
- বাস্তবতা ও সমাজচিত্রণ – বিশেষত আধুনিক যুগে সমাজবাস্তবতা, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বিদ্রোহ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
- বহুমাত্রিক ধারা – কবিতা, উপন্যাস, নাটক, লোকসাহিত্য, গান, প্রবন্ধ—সব মিলিয়ে সাহিত্য একটি সমন্বিত রূপ পেয়েছে।
বাংলা সাহিত্য কেবল কিছু লেখা নয়, বরং এটি হলো একটি জাতির আত্মার দলিল। যুগে যুগে কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা তাঁদের অনুভূতি, ভাবনা, আনন্দ-বেদনা, সমাজের পরিবর্তন—সবকিছুকেই সাহিত্যে ধারণ করেছেন। প্রাচীন চর্যাপদ থেকে শুরু করে সমকালীন কবিতা, গল্প, উপন্যাস—সব মিলিয়ে বাংলা সাহিত্য আজ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডার। এটি একদিকে ব্যক্তির অন্তর্জগৎ, অন্যদিকে সমাজ-সংস্কৃতির আয়না। তাই বাংলা সাহিত্যকে বলা যায়—“অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের এক চিরন্তন সেতুবন্ধন”।
বর্তমানে সাহিত্যচর্চা কেবল নামমাত্র। সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে যেসব কিছুই লেখা হোক না কেন, একটা সময়ের পর তার স্বীকৃতি হয়তো বা মুছে যাবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেগুলি লেখা হচ্ছে খাতায়-কলমে কিংবা বইয়ের পাতায়। আবার এটাও সত্য যে সব কিছু তো বইতে লেখা যায় না, সমাজের তকমায় রবীন্দ্রনাথ একজনই।
তথ্যসূত্র
- মনসামঙ্গল – বিজয় গুপ্ত, নরসিংহ, কেতকাদাস প্রমুখ।
- চণ্ডীমঙ্গল – কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, দ্বিজমাধব।
- ধর্মমঙ্গল – গণেশরাম চক্রবর্তী।
- শ্রীকৃষ্ণকীর্তন – বড়ু চণ্ডীদাস।
- মেঘনাদবধ কাব্য – মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
- কপালকুণ্ডলা, আনন্দমঠ, বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
- হাজার চুরাশির মা, অরণ্যের অধিকার – মহাশ্বেতা দেবী।



